ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান

Bangladesh USA Flag

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে ছিল বিশ্ববাসীর প্রচণ্ড আগ্রহ। একজন নয়া মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিদেশ নীতি কী হতে পারে, এ থেকেই মূলত এমন আগ্রহ জন্ম লাভ করে থাকে। ২০২৪-এর এই নির্বাচনে অবশেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিরাট বিজয়ের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।

এদিকে, বাংলাদেশে মাত্র তিন মাস আগে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের। গঠিত হয় ড. ইউনুসের নেতৃত্বে নতুন সরকার। ড. ইউনুসের এই সরকারের প্রতি নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি কী হতে পারে, তা নিয়ে চলছে যথেষ্ট বিশ্লেষণ। মার্কিন নির্বাচনের প্রচারাভিযানের সময় আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী, সমর্থকরা একেবারে প্রকাশ্যে কামনা করেছিলেন-ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে যাক। 

আওয়ামী লীগের এ নেতাকর্মীরা মনে করেন, 'নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রয়েছে অন্তরঙ্গ সখ্য এবং তা জো বাইডেন কিংবা কমলার চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। তাই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহিত করবেন। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান ইউনূস সরকারের ওপর ট্রাম্পের চোখ রাঙানিতে ঘটবে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন।' এমন উদ্ভট সমীকরণ থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনেপ্রাণে চাইছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে যাক। অতঃপর ট্রাম্প সত্যিই বিজয়ী হলেন আর আওয়ামী শিবিরে ছড়িয়ে উচ্ছ্বাস। তড়িঘড়ি করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে জানানো হলে' অভিনন্দন। 

কিন্তু বাস্তবে ট্রাম্পের বিজয়ে অওয়ামী লীগের সুদিন ফিরবে না। বাংলাদেশ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি হাসিনা ও আওয়ামী লীগ অভিমুখী হবে না। কেননা বাংলাদেশ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র আর ভারত আগের মতো একসঙ্গে ও এক নীতিতে চলবে না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখবে না। ২০০১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ঘোষণা করেছিলেন বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এই সন্ত্রাসবাদ দমন ইস্যুতে ভারত- যুক্তরাষ্ট্র গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পূর্ববর্তী মেয়দের (২০১৬-২০২০) শেষ দিকে আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করেন। অতঃপর নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মাসের মাথায় ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট সবশেষ মার্কিন সৈন্য আফগানিস্তান থেকে চলে যায়। এভাবে কার্যত মার্কিনীদের বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ দমনের ২০ বছরের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। ফলে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কমে যায় ভারতের কদর।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার দ্বিতীয় জায়গা ছিল উভয়ের চীনবিরোধী ভূমিকা। কিন্তু দৃশ্যত ভারত নিজেই চীনবিরোধী অবস্থান থেকে পিছু হটছে। রাশিয়ার কাজানে সদ্যসমাপ্ত (২২- ২৪ অক্টোবর, ২০২৪) ব্রিকস সম্মেলনে যার যথেষ্ট আলামত পাওয়া গেল। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উভয়ে অতীতের সব বিবাদ ভুলে ব্যাবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন। ভারত এখন সহজলভ্য চীনা ঋণ নিয়ে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছে। এ চীনা ঋণ পেতে ভারত ভীষণ উদগ্রীব। এ নিয়ে ভারত কার্যত চীনের সঙ্গে পথচলা ঠিক করে ফেলেছে। ভারত এখন হিসাব করেছে, সে চীনবিরোধী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খাতির রেখে দেশের জন্য যা পাবে, তার চেয়ে বরং চীনের ঘনিষ্ঠ হলে লাভ হবে অনেক বেশি। এভাবে এখন ভারতের প্রধান স্বার্থটাই বদলে গেছে। এমতাবস্থায় নিছক চীনবিরোধী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোলে উঠে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব প্রতিপত্তি খাটানোটা ভারতের জন্য বেশ অলাভজনক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ে ভারতের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা প্রতিধ্বনিত হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের কথা থেকে। নির্বাচনে ট্রাম্প যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন তিনি ক্যানবেরাতে ভারত-অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড এই ত্রিদেশীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীবর্গের সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হলো: 'যিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না কেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন বাকি দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে একলা চলতে যাচ্ছে। আর এমন নীতির ফাঁদেই সে আটকা পড়েছে। ইতিপূর্বে বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে ধরনের প্রাধান্য ও মাহাত্ম্য ছিল, তা হয়তো চলমান থাকবে না। তাই আমাদের এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।'

ভারত মূলত চীন-রাশিয়ার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ব্রিকসের মাধ্যমে নয়া বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করতে চাইছে। এ নিয়ে আগামী দিনে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হতে পারে যথেষ্ট মনোমালিন্য। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে বাণিজ্যিক সুবিধা নিচ্ছে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখছে। আগাম দিনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতকে এই দ্বিমুখী নীতি পরিত্যাগ করার আহ্বান জানাতে পারেন। এটা নিয়েও শুরু হতে পারে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র মনোমালিন্য।

ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে কী চান এবং তার বিদেশনীতি কেমন হবে, তা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে তার পূর্ববর্তী (২০১৬-২০২০)-এর শাসনামলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আব্রাহাম অ্যাকোর্ডের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পরিকল্পনা তিনিই চূড়ান্ত করেন। নাগেরনো কারাবাখ যুদ্ধে খ্রিষ্টান রাষ্ট্র আর্মেনিয়াকে রক্ষায় ট্রাম্প কোনো ভূমিকা নেননি। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তিনি ভারতকে দেননি কোনো বিশেষ বাণিজ্যিক ছাড়। ন্যাটো কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পর্কে ট্রাম্প পোষণ করেছিলেন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। জোটবদ্ধ সামরিক বলয় তৈরির পরিবর্তে দ্বিরাষ্ট্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই ছিল তার আকাঙ্ক্ষা। ট্রাম্প তার চার বছরের শাসনামলে কোনো যুদ্ধবিগ্রহ করেননি। বরং উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সঙ্গে করেছিলেন বৈঠক। অর্থাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ছিল পৃথিবীব্যাপী সব যুদ্ধ ত্যাগ করে চীনের বাণিজ্যিক উত্থানকে ঠেকানো।

ডোনাল্ড ট্রাম্প পোষণ করেন যথেষ্ট জাতীয়তাবাদী ধারণা। তার লক্ষ্য 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন।' তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাখতে চান। তিনি চান না যুক্তরাষ্ট্র অন্যের জন্য যুদ্ধ করুক। ট্রাম্প অন্যের আইডিওলজি বাস্তবায়নের জন্যও যুদ্ধ করবেন না। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য মার্কিন অর্থনীতিকে ঠিক রেখে চীনের উত্থান ঠেকানো। রিপাবলিকান দল ও এর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের গুরুত্ব দেবে। তবে বরাবরের মতো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের আধিপত্য ও অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টায় সমর্থন দিয়ে যাবে এবং ইরানের প্রতি কঠোর হবে। কিন্তু এই মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া বাকি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭০-১৯৮০-এর দশকের মতো সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইবে, দ্বিরাষ্ট্রিক সম্পর্ক গড়বে। যার মধ্যে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে। বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়া ও এরশাদের আমলের মতো পুনরায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক তৈরি হবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলবে। 

বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের কথা কিংবা পরামর্শ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করতে পারবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ড. ইউনূসের রয়েছে ব্যাপক ব্যক্তি পরিচিতি ও প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার থিংকট্যাংক, ইনটেলেক্ট, একাডেমিক ও রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে তার রয়েছে বিশেষ সম্পর্ক। এরা বাংলাদেশ বিষয়ে ট্রাম্প প্রসাসনকে যথেষ্ট গাইড করবেন। এর ফলে ড. ইউনূস সরকার শুধু রিপাবলিকানদেরই সমর্থন পাবেন না, সেই সঙ্গে থাকবে ডেমোক্র্যাটদেরও সমর্থন। অর্থাৎ বাংলাদেশের ড. ইউনুস সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বাই-পার্টিজান (দ্বিদলীয়) সমর্থন লাভ করবে।

• লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এনএন

Post a Comment

0 Comments