ঈসা (আ.) এর জন্ম ও মৃত্যু

 


মহান রাব্বলি আলামিন আল্লাহ তাআলার নবী ও রাসূল হজরত ঈসা (আ.)। ফিলিস্তিনি আরব অধ্যুষিত জর্দান নদীর পশ্চিম তীর অঞ্চলের বায়তুল লাহামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পবিত্র কোরআনুল কারিমে হজরত ঈসা (আ.) এর নাম বিভিন্ন প্রসঙ্গে ২৫ বার উল্লেখ হয়েছে।

হজরত মারইয়াম (আ.) এর গর্ভে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঈসা (আ.)-কে পিতা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন। মারইয়াম নামে কোরআনুল কারিমে একটি স্বতন্ত্র সূরাও রয়েছে। মারইয়াম শব্দটি কোরআন কারিমে নানানভাবে ৩৫ বার উল্লিখিত হয়েছে। হজরত ঈসা (আ.) এর সৃষ্টি হজরত আদম (আ.) এর মতো। আল্লাহ কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করে বলেন, ‘إِنَّ مَثَلَ عِيسَىٰ عِندَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ ۖ خَلَقَهُ مِن تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُن فَيَكُونُ

অর্থ: ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদমেরই মতো। তাকে মাটি দিয়ে তৈরি করেছিলেন এবং তারপর তাকে বলেছিলেন হয়ে যাও, সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলেন’। (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৫৯)

ঈসা (আ.) সম্পর্কে ইসলামের বিশ্বাস

হজরত ঈসা (আ.) ছিলেন আল্লাহ তাআলার প্রেরিত রাসূল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, مَّا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ ۖ كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ ۗ انظُرْ كَيْفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ الْآيَاتِ ثُمَّ انظُرْ أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ

অর্থ: ‘মারইয়াম পুত্র ‘ঈসা রাসূল ছাড়া কিছুই ছিল না। তার পূর্বে আরো রাসূল অতীত হয়ে গেছে, তার মা ছিল সত্যপন্থী নারী, তারা উভয়েই খাবার খেত; লক্ষ্য কর তাদের কাছে (সত্যের) নিদর্শনসমূহ কেমন সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরছি আর এটাও লক্ষ্য কর যে, কীভাবে তারা (সত্য হতে) বিপরীত দিকে চলে যাচ্ছে। ’ (সূরা: আল মায়িদা, আয়াত: ৭৫)

আল্লাহর নবী হজরত ঈসা (আ.) আল্লাহর পুত্র নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে বলেন, لَقَدۡ كَفَرَ الَّذِیۡنَ قَالُوۡۤا اِنَّ اللّٰهَ هُوَ الۡمَسِیۡحُ ابۡنُ مَرۡیَمَ ؕ وَ قَالَ الۡمَسِیۡحُ یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اعۡبُدُوا اللّٰهَ رَبِّیۡ وَ رَبَّكُمۡ ؕ اِنَّهٗ مَنۡ یُّشۡرِكۡ بِاللّٰهِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰهُ عَلَیۡهِ الۡجَنَّۃَ وَ مَاۡوٰىهُ النَّارُ ؕ وَ مَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ اَنۡصَارٍ

لَقَدۡ كَفَرَ الَّذِیۡنَ قَالُوۡۤا اِنَّ اللّٰهَ ثَالِثُ ثَلٰثَۃٍ ۘ وَ مَا مِنۡ اِلٰهٍ اِلَّاۤ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ ؕ وَ اِنۡ لَّمۡ یَنۡتَهُوۡا عَمَّا یَقُوۡلُوۡنَ لَیَمَسَّنَّ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا مِنۡهُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ

অর্থ: ‘যারা বলে যে মারইয়ামের পুত্র মাসিহই আল্লাহ, তারা তো কুফরি করেছে। অথচ মাসিহ বলেছিল, হে বনি ইসরাইল! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, যিনি আমার রব এবং তোমাদেরও রব। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই। নিশ্চয়ই তারা কাফির, যারা বলে, আল্লাহ তিনের এক; অথচ এক উপাস্য ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যদি তারা তাদের উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তাহলে তাদের মধ্যে যারা কুফরির ওপর অটল থাকবে, তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে। (সুরা আল-মায়িদা ৭২-৭৩)

মুসলিমদের বিশ্বাস হজরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ তাআলা জীবিত অবস্থায় আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। কেয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে তিনি শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নবীর উম্মাত হয়ে আবার দুনিয়াতে আগমন করবেন। দাজ্জালকে হত্যা করবেন, ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের পতন ঘটাবেন। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন, শেষ নবীর শরিয়তের মাধ্যমে বিচার-ফয়সালা করবেন। ইসলামের বিলুপ্ত হওয়া আদর্শগুলো পুনর্জীবিত করবেন। পৃথিবীতে নির্দিষ্ট সময় অবস্থান করার পর তিনি মৃত্যু বরণ করবেন। মুসলমানগণ তার জানাজা নামাজ পড়ে তাকে দাফন করবেন। তার আগমনের পক্ষে কোরআন ও সহিহ হাদিসে অনেক দলিল রয়েছে।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, وَّ قَوۡلِهِمۡ اِنَّا قَتَلۡنَا الۡمَسِیۡحَ عِیۡسَی ابۡنَ مَرۡیَمَ رَسُوۡلَ اللّٰهِ ۚ وَ مَا قَتَلُوۡهُ وَ مَا صَلَبُوۡهُ وَ لٰكِنۡ شُبِّهَ لَهُمۡ ؕ وَ اِنَّ الَّذِیۡنَ اخۡتَلَفُوۡا فِیۡهِ لَفِیۡ شَكٍّ مِّنۡهُ ؕ مَا لَهُمۡ بِهٖ مِنۡ عِلۡمٍ اِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ ۚ وَ مَا قَتَلُوۡهُ یَقِیۡنًۢا 

بَلۡ رَّفَعَهُ اللّٰهُ اِلَیۡهِ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ عَزِیۡزًا حَكِیۡمًا

وَ اِنۡ مِّنۡ اَهۡلِ الۡكِتٰبِ اِلَّا لَیُؤۡمِنَنَّ بِهٖ قَبۡلَ مَوۡتِهٖ ۚ وَ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ یَكُوۡنُ عَلَیۡهِمۡ شَهِیۡدًا

অর্থ: ‘তারা বলে আমরা মারইয়ামের পুত্র আল্লাহর রাসূল ঈসাকে হত্যা করেছি। মূলত তারা তাকে হত্যা করতে পারেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করতে পারেনি; বরং তাদেরকে সন্দেহে ফেলা হয়েছে। নিশ্চয়ই যারা তাতে মতবিরোধ করেছিল তারাই সে বিষয়ে সন্দেহে রয়েছে। কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত এ বিষয়ে তাদের কোনো জ্ঞান নেই। প্রকৃতপক্ষে তারা তাকে হত্যা করতে পারেনি। আল্লাহ তাকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী। আহলে কিতাবদের প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তার প্রতি ঈমান আনয়ন করবে এবং উত্থান দিবসে তিনি তাদের ওপর সাক্ষ্য প্রদান করবেন’। (সুরা নিসা ১৫৭-১৫৯)

আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন, وَ اِنَّهٗ لَعِلۡمٌ لِّلسَّاعَۃِ فَلَا تَمۡتَرُنَّ بِهَا وَ اتَّبِعُوۡنِ ؕ هٰذَا صِرَاطٌ مُّسۡتَقِیۡمٌ

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই ঈসা (আ.) কেয়ামতের নিদর্শন। সুতরাং তোমরা কেয়ামতের ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহ পোষণ করো না। আমার অনুসরণ করো। এটাই সরল পথ। (সূরা: যুখরুফ, আয়াত: ৬১) অত্র আয়াতে কেয়ামতের পূর্বে হজরত ঈসা (আ) এর আগমনের কথা বলা হয়েছে। এটি হবে কেয়ামতের একটি বড় আলামত। তার আগমন কেয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার প্রমাণ বহন করবে। (তাফরিরে কুরতুবি, তাবারী ও ইবনে কাসির)

হজরত ঈসা (আ.) কেয়ামতের আগে দুনিয়ায় আগমনের বিষয়ে অস্যংখ্য সহিহ হাদিস রয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ঐ আল্লাহর শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। অচিরেই ন্যায় বিচারক শাসক হিসেবে ঈসা (আ.) তোমাদের মাঝে আগমন করবেন।

তিনি ক্রুশচিহ্ন ভেঙ্গে ফেলবেন, শুকর হত্যা করবেন। জিজিয়া প্রত্যাখ্যান করবেন। ধন-সম্পদ প্রচুর হবে এবং তা নেয়ার মতো কোন লোক পাওয়া যাবে না। এমনকি মানুষের কাছে একটি সেজদা দুনিয়া এবং তার মধ্যকার সমস্ত বস্তু হতে শ্রেষ্ঠ হবে।

আবু হুরায়রা রা. বলেন তোমরা চাইলে আল্লাহর এই বাণীটি পাঠ কর, وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا আহলে কিতাবদের প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তার প্রতি ঈমান আনয়ন করবে। উত্থান দিবসে তিনি তাদের উপর সাক্ষ্য প্রদান করবেন। (বুখারি, মুসলিম)

অন্য হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের একটি দল হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে কেয়ামত পর্যন্ত লড়াই করে বিজয়ী থাকবে। অতঃপর ঈসা (আ.) আগমন করবেন। সেদিন মুসলমানদের আমির তাকে লক্ষ্য করে বলবেন আসুন! আমাদের ইমামতি করুন। তিনি বলবেন না; বরং তোমাদের একজন অন্যজনের আমির। এ কারণে যে, আল্লাহ এই উম্মতকে সম্মানিত করেছেন। (মুসলিম)

ঈসা (আ.) এর মৃত্যু বরণ ও দাফন

হজরত ঈসা (আ.) কোথায় মৃত্যুবরণ করবেন এ ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায় না। তদুপরি কোনো কোনো আলেম বলেন, তিনি মদিনায় ইন্তেকাল করবেন। মদিনাতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সঙ্গে তাকে দাফন করা হবে।

ইমাম করতুবি বলেন, তার কবর কোথায় হবে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন বায়তুল মাকদিসে আবার কেউ বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মদিনায় তার কবর হবে। (লাওয়ামেউল আনওয়ার, (২/১১৩)

ডেইলি-বাংলাদেশ/জিআর

Post a Comment

0 Comments